28.8 C
Chittagong
Tuesday, 15 September 2026
বাড়িTop Newsগারে-ই-সিজদাহ: যেখানে রাসূলের সুবাস এখনো প্রবাহমান

গারে-ই-সিজদাহ: যেখানে রাসূলের সুবাস এখনো প্রবাহমান

  CNN Bangladesh

|| মোহাম্মদ আবদুর রহিম || মদিনা মুনাওয়ারা থেকে ফিরে || 

- Advertisement -nagad

কিছু স্থান শুধু স্থান নয়—
কিছু স্থান ইতিহাসের জীবন্ত স্মৃতি।
কিছু পথ শুধু পাথরের পথ নয়—
সে পথ হৃদয়কে নিয়ে যায় ১৪০০ বছর আগের এক মহান সময়ের কাছে।

গারে সিজদাহ—আমার কাছে তেমনই এক পবিত্র স্মৃতির স্থান।

৪ আগস্ট ২০২৬ দিবাগত রাত। পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারায় অবস্থানরত এক ভাইয়ের মেহমানদারি গ্রহণ করলাম। সৌদি আরব সময় রাত ১২টায় আমরা মদিনা শরীফের বিভিন্ন পবিত্র নিদর্শন জিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

আমাদের সঙ্গে ছিলেন দাওয়াতে ইসলামীর জিম্মাদার লোকমান আত্তারী।

প্রথমে আমরা জিয়ারত করলাম হযরত জাবের (রা.)-এর বাড়ি। এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি বিখ্যাত মোজেজার স্মৃতি। নবীজি ﷺ প্রায় এক হাজার সাহাবি নিয়ে সেখানে মেহমানদারি গ্রহণ করেছিলেন। সে ঘটনা দীর্ঘ; আজ সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না।

সেখান থেকে আমরা রওনা হলাম গারে সিজদাহর উদ্দেশ্যে।

যে পর্বতে গারে সিজদাহ অবস্থিত, সেটি জাবালে সিলা নামে পরিচিত।

একসময় চ্যানেল আইয়ের একটি অনুষ্ঠানে গারে সিজদাহ সম্পর্কে দেখেছিলাম। সেই অনুষ্ঠান দেখার পর মনে মনে একটি আকাঙ্ক্ষা জন্মেছিল—

কোনো দিন যদি সেই গুহায় যেতে পারতাম!
যে গুহার সঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইবাদত ও সিজদার স্মৃতি জড়িয়ে আছে!

আল্লাহ পাক সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করলেন।

আলহামদুলিল্লাহ।

লোকমান আত্তারীর নেতৃত্বে আমাদের ভাতিজা রায়হান, ফাইন্যান্স ডিরেক্টর এ বি এম কামাল উদ্দিন, জিএম আরিফুর ইসলাম, মোশারফ হোসেনসহ আমরা জাবালে সিলায় চড়তে শুরু করলাম।

গভীর রাত।

চারদিকে নীরবতা।

পায়ের নিচে পাথুরে পথ।
কিন্তু আশেকে রাসুলদের অবিরাম পদচারণায় সেই দুর্গম পাহাড়েও যেন একটি পথ তৈরি হয়ে গেছে।

পাহাড়ের নিচ থেকেই গারে সিজদাহ চোখে পড়ছিল।

যতই ওপরে উঠছিলাম, ততই হৃদয়ের স্পন্দন যেন বেড়ে যাচ্ছিল।

মনে হচ্ছিল—
আর একটু… আর একটু গেলেই সেই স্থান, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার প্রিয় নবী ﷺ-এর স্মৃতি!

খন্দকের যুদ্ধের সেই কঠিন সময়। দিনের বেলায় সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরিখা খননের ব্যস্ততা, আর রাতের নীরবতায় আল্লাহর দরবারে ইবাদত ও দোয়া।

বর্ণিত আছে, হযরত মু‘আয (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে খুঁজতে খুঁজতে একসময় তাঁকে সিজদারত অবস্থায় দেখতে পান। জিজ্ঞেস করলে নবীজি ﷺ জানান, হযরত জিবরাঈল (আ.) তাঁর উম্মতের ব্যাপারে সুসংবাদ নিয়ে এসেছেন। তাই তিনি তাঁর রবের শুকরিয়া আদায় করছেন।

এই ঘটনা মনে করতে করতে আমরা ধীরে ধীরে সেই কাঙ্ক্ষিত স্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।

অবশেষে পৌঁছে গেলাম।

সামনে কয়েকটি জায়নামাজ বিছানো। কয়েকজন আরব যুবক সেখানে ছিলেন।আমার মনে হল তারা বহিমিয়ান।

গুহার কাছাকাছি এমন কিছু চিহ্ন দেখানো হলো, যেগুলোকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাত ও পায়ের পবিত্র চিহ্ন।

আমরা গভীর আবেগে সেগুলো দেখলাম।স্পর্শ করলাম। চুমু খেলাম। মাথায় বুকে নাকে ধারণ করলাম। সুঘ্রান স্পষ্ট। হায়! হায় একি দেখলাম। জীবন্ত পাথর বলছে আল্লাহর রাসূল এখানে পা রেখেছিল এখানে হাত রেখেছিল এখানে সিজদা দিয়েছিল, আমি জবলে সিলা,কতই সৌভাগ্যবান।

মনে হলো—পাথরের ওপরও ইতিহাস কথা বলে।

ভাতিজা রায়হান একে একে আমাদের সবকিছু দেখিয়ে দিচ্ছিল। সঙ্গে ছিলেন লোকমান আত্তারী।

অবশেষে আরও একটু সামনে এগিয়ে, সামান্য উপরে উঠতেই দেখা দিল সেই কাঙ্ক্ষিত গারে সিজদাহ!

সেই মুহূর্তটি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

জায়নামাজ বিছানো ছিল। আমরা সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলাম। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সিজদার স্থান হিসেবে যে স্থানটি দেখানো হয়, সেটি দেখলাম।
উত্তপ্ত পাথরে সিজদার স্থানটি এখনো একটু ভেজা ভেজা।

হৃদয় তখন আবেগে ভরে গেছে।

সেই স্থান স্পর্শ করলাম।কপালে লাগালাম। এই সিজদায় আল্লাহর রহমত নাযিল হয়েছিল। উম্মতের সুসংবাদ এসেছিল। এই সেই জায়গা।

আল্লাহর কী কুদরত!

যেখানে আল্লাহর প্রিয় হাবিব ﷺ-এর কপাল মোবারক লেগেছিল , উত্তপ্ত পাথরের মাঝেও সেখানে এক ধরনের স্নিগ্ধতা অনুভব করলাম।

তারপর প্রবেশ করলাম সেই গুহায়—যে গুহার সঙ্গে রাসূলে খোদা ﷺ-এর অবস্থান ও ইবাদতের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

গুহার ধুলোবালি শরীরে লাগল।

চারদিকে পাথর।

অন্ধকার।

আর সেই অন্ধকারের মধ্যেও মনে হচ্ছিল—
কত ইতিহাস এখানে ঘুমিয়ে আছে!

গুহার অপর প্রান্তে এগিয়ে গেলাম। সেখান দিয়ে বাতাস বের হচ্ছিল।

বাতাসের সেই স্পর্শে মনে হলো—
এ যেন শুধু বাতাস নয়, জীবন্ত শরীরের সুঘ্রাণ, ইতিহাসের এক দীর্ঘশ্বাস!

মনে মনে ভাবলাম—

১৪০০ বছর আগে যে সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সরাসরি সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন, তাঁরা কতই না সৌভাগ্যবান!

তাঁরা তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল দেখেছেন।
তাঁর কণ্ঠ শুনেছেন।
তাঁর সঙ্গে হেঁটেছেন।
তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন।
তাঁর পবিত্র সান্নিধ্যের সুবাস গ্রহণ করেছেন।

আর আমরা?

আমরা শত শত বছর পরে এসে শুধু তাঁর স্মৃতির সঙ্গে নিজেদের হৃদয়কে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি।

তবুও আশার শেষ নেই।

কারণ তিনি আমাদের নবী।
তিনি আমাদের প্রিয়তম রাসুল ﷺ।
তাঁর প্রতি ভালোবাসাই আমাদের ঈমানের সৌন্দর্য।
আমরা উপযুক্ত হলে তিনি আমাদের দেখা দিবেন।
মনে পড়ে গেল, অলিউল্লাহ আশেকীর সেই নাত
,মদিনা মদিনা আশেক ও মুমিনের ঠিকানা।
দিদার চেয়ে কাঁদো তোমরা, হও না নবীর দিওয়ানা।

গারে সিজদাহ থেকে ফেরার সময় বারবার মনে হচ্ছিল—

যে পাহাড়ে তাঁর প্রিয় নবীর সিজদার স্মৃতি আছে,
যে বাতাসে তাঁর স্মৃতির কথা মনে পড়ে,
সেই স্থান থেকে কীভাবে একজন মানুষ খালি হৃদয়ে ফিরে আসতে পারে?

হে আল্লাহ!

আপনার প্রিয় হাবিব, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ-এর প্রতি আমাদের ভালোবাসা আরও বাড়িয়ে দিন।

তাঁর সুন্নাহর ওপর অটল থাকার তাওফিক দিন।
আমাদের বংশ-পরম্পরায় সবাইকে তোমার নবীর সুন্নতের উপর অটল রাখিও।

আমাদের অন্তরকে মদিনার ভালোবাসায় পূর্ণ করে দিন।

আর যাঁরা কোনো দিন গারে সিজদাহর মতো পবিত্র স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বসে আছেন—
হে আল্লাহ, তাঁদেরও সেই সৌভাগ্য দান করুন।

আমাদের সবাইকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসার সুবাসে জীবন সাজানোর তাওফিক দিন।

আল্লাহুম্মা আমিন। 🤲

ﷺ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

📍 গারে সিজদাহ — জাবালে সিলা, মদিনা মুনাওয়ারা

নোট: ইংরেজিতে “Ghar-e-Sajdah / Cave of Bani Haram” লিখে সার্চ করলে এ স্থান সম্পর্কে বিভিন্ন ভিডিও ও বর্ণনা পাওয়া যাবে।

মদিনা মুনাওয়ারা—
যেখানে দূর থেকেও হৃদয় বলে ওঠে:
“ইয়া রাসুলাল্লাহ ﷺ, আপনাকে ভালোবাসি।”

- Advertisment -

সর্বশেষ

Translate »