নিউজ ডেস্ক, সিএনএন বাংলাদেশ :: একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পর মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল আলোচনা। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্র নিয়ে। তবে সংবাদটির বিষয়বস্তুর চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে সেখানে প্রকাশিত একটি ছবি। কারণ, ছবিতে যাকে দেখানো হয়েছে, তিনি দাবি করছেন—সংবাদে উল্লেখিত ব্যক্তি তিনি নন।
তার নাম ইউসুফ। আর এ নামের মিলই তার জীবনে নেমে এনেছে চরম দুর্ভোগ।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রকৃত অভিযুক্তের পরিবর্তে তার ছবি প্রকাশ হওয়ায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মন্তব্য, শেয়ার ও আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—”এই ইউসুফই কি সেই ইউসুফ?” কেউ আবার নিশ্চিত ধরেই মন্তব্য করতে থাকেন। একটি ভুল ছবি কীভাবে একজন মানুষের সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক জীবন এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে—সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে শেষমেষ তার ছবি ডিলিট করায় পত্রিকাটির চট্টগ্রাম প্রধান সহ প্রতিবেদককে ধন্যবাদ জানান তিনি।
ইউসুফ বলেন, সংবাদটি প্রকাশের পর থেকেই একের পর এক ফোনকল আসতে থাকে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ব্যবসায়িক অংশীদার, রাজনৈতিক সহকর্মী—সবার একই প্রশ্ন, “ঘটনা কী?”
প্রতিটি ফোনকলে তাকে একই ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে—সংবাদে প্রকাশিত ব্যক্তি তিনি নন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পরিচিত-অপরিচিত বহু মানুষ তার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। তিনি বলেন, “একটা সময় মনে হচ্ছিল, নিজের পরিচয়টাই যেন নতুন করে প্রমাণ করতে হচ্ছে।”
পরিবারও পড়েছে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ইউসুফের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার সবচেয়ে বড় মানসিক ধাক্কা খেয়েছে তার পরিবার।
তিনি জানান, তার দুই সন্তান আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম -এ অধ্যয়নরত। একজন প্রকৌশল বিভাগে এবং অন্যজন আইন বিভাগে পড়ছেন। সংবাদ প্রকাশের পর তাদের সহপাঠী, পরিচিতজন এবং আত্মীয়দের কাছ থেকেও নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমার সন্তানদের এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে, কখনও ভাবিনি। তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।”
ছেলেকে নিয়েও পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ইউসুফ অভিযোগ করেন, প্রতিবেদনে তার ছেলেকে নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
তার দাবি, অতীতে তার ছেলে ভুলবশত একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিল। পরে তদন্তে পুলিশ তাকে নির্দোষ হিসেবে শনাক্ত করে এবং আদালতে সে বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে। সে সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় দৈনিক ও একটি বেসরকারি টেলিভিশনও বিষয়টি সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করেছিল।
তার প্রশ্ন, “যে বিষয়টি বহু আগেই আইনগতভাবে পরিষ্কার হয়েছে, সেটি আবারও কেন বিভ্রান্তিকরভাবে সামনে আনা হলো?”
‘একই নামকে পুঁজি করে পরিকল্পিত হয়রানি’ ইউসুফের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্বার্থান্বেষী চক্র একই নামের সুযোগ নিয়ে তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিতর্কে জড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিনি দাবি করেন, সাংবাদিক, প্রশাসন এবং বিভিন্ন সংস্থার কাছে বারবার বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
তীব্র সমালোচনার পর সরিয়ে নেওয়া হয় ছবি ইউসুফের দাবি, সংবাদটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই ছবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং ভুল ব্যক্তির ছবি ব্যবহারের অভিযোগ করেন।
এরপর একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট জাতীয় দৈনিক তাদের অনলাইন প্রতিবেদনে প্রকাশিত ছবিটি সরিয়ে নেয়।
প্রকৃত ইউসুফ কে? নাগরিকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, আলোচিত মামলার অভিযুক্ত ইউসুফকে স্থানীয়ভাবে “অক্সিজেনের ইউসুফ” নামে চেনেন অনেকে।
একাধিক সূত্রের দাবি, তার সঙ্গে ডেভিড ইমনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া তিনি চট্টগ্রাম নগরের একটি রেস্টুরেন্ট ব্যবসার অংশীদার বলেও জানা গেছে। আরও একটি সূত্রের দাবি, তার গ্রামের বাড়ি বরিশাল।
‘রাজনীতি করেছি, জেল খেটেছি; কিন্তু এমন অপমান পাইনি’ নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ইউসুফ।
তিনি বলেন, “রাজনীতি করতে গিয়ে হামলা-মামলা, জেল-জুলুম সবই সহ্য করেছি। মানুষের জন্য কাজ করেছি, সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকেছি। কিন্তু কোনো অপরাধ না করেও একটি ভুল ছবির কারণে আজ আমাকে অপরাধীর মতো ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি অসুস্থ। এই মানসিক চাপ আমার শারীরিক অবস্থাকেও আরও খারাপ করে দিয়েছে। এই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”
সাংবাদিকতায় পরিচয় যাচাই কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, একই নামের একাধিক ব্যক্তি থাকলে ছবি, পরিচয় এবং অন্যান্য তথ্য প্রকাশের আগে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। একটি ভুল ছবি শুধু একজন ব্যক্তির সুনামই নষ্ট করে না; তার পরিবার, পেশা, সামাজিক অবস্থান এবং নিরাপত্তাকেও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বিশেষ করে অনলাইন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি ভুল তথ্য বা ছবি কয়েক মিনিটেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরে সংশোধন করা হলেও প্রথম দফার ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রেই আর পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়না।

