আওয়ামী লীগ আমলে তৈরি করা তালিকাভুক্তরা ডিসি হচ্ছেন না। নতুন করে তালিকা তৈরি করে পদায়ন করা হবে। জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগের জন্য কর্মকর্তা বাছাই কমিটির প্রস্তুতিমূলক সভা আজ সকাল সাড়ে ১০টায় মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে তার অফিস কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব উপস্থিত থাকবেন। বাছাই কমিটির সম্মানিত সকল সদস্যকে উক্ত সভায় উপস্থিত থাকার জন্য নির্দেশক্রমে বিনীত অনুরোধ করা হয়েছে।
জানা গেছে, মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে জেলা প্রশাসক পদে পদায়নের জন্য অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের প্রণীত ৪৫ কর্মকর্তার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। চাকরিকালীন সময়ে নানা ধরণের অনিয়মে জড়িয়ে পড়া ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়। এ কারণে তৎকালিন সরকার তাদের পদোন্নতি না দেয়ায় বঞ্চিত ছিলেন। এসব কর্মকর্তা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের আমলে সুযোগ বুঝে নিজেদের পদ-বঞ্চিত দাবি করে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছেন। একই সঙ্গে ডিসি পদে নিয়োগ পাওয়ার পথও নিশ্চিত করে ফেলেছে বলেও ব্যাচভিত্তিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে। এ ঘটনায় সৎ, চৌকস ও সত্যিকার পদ-বঞ্চিত কর্মকর্তারা হতাশ। বলছেন, এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের মাঠ প্রশাসনের দায়িত্বে দেওয়া হলে সরকারের সু-শাসন নিশ্চিত হবে না। বরং এর পরিবর্তে দুর্নাম বাড়বে। কারণ সরকারের উন্নয়ন ধারাবাহিকতায় ডিসির পদটি খুবই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টানা ১৫ বছরে হাসিনা সরকারের সময়ে প্রশাসনে এক ধরণের সুবিধাভোগী আমলার উদ্ভব ঘটেছিল। তাদের বলয়ের বাইরে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়নি। এমনকি জেলা প্রশাসক থেকে উচ্চতর ধাপে পদোন্নতি ও সচিব করার ক্ষেত্রেও তাদের শক্ত বলয় ছিল। ফলে হাইব্রিড কর্মকর্তার কারণে সরকারের মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে অভিজ্ঞ ও চৌকস কর্মকর্তারা ছিলেন কোনঠাসা ও বঞ্চিত। এসব নানা ধরণের অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির বাইরে শীর্ষ কর্মকর্তাদের আর্শিবাদ কর্মকর্তারা ছাড়া অন্য কাউকে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখা যেত না বলেও অভিযোগ রয়েছে। চৌকস, সৎ ও কর্মদক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মস্থলে মেধার স্বাক্ষর রাখার পরও বেশ কিছু জেলার কর্মকর্তাদের সচিব করা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এর মধ্যে সাতক্ষীরা, বগুড়া জেলার কর্মকর্তারা অবহেলিত ছিল বেশি। এই কর্মকান্ডের কারণে সর্বদা সমালোচিত ছিলো বিগত আওয়ামী লীগ সরকার।
গত ৫ আগস্ট কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারে দায়িত্ব কাঁধে পড়ে অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের ওপরে। সেখানে প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধ, সুশাসন নিশ্চিত করা, সৎ ও চৌকস কর্মকর্তাদের যোগ্য আসনে পদায়ন ও পদোন্্নতি প্রদান প্রত্যাশা ছিল সর্বাগ্রে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির কারণে নমনীয় কর্মকর্তা সুযোগ বুঝে সম্মুখে চলে আসে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। নিজেদের দাপ্তরিক দায়িত্ব ফেলে সারাদিন নিজেকে বঞ্চিতদের কাতারে ফেলে জন-প্রশাসন ও সচিবালয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। ইতিমধ্যে যুগ্ম-সচিব পর্যন্ত পদোন্নতি হয়েছে। এখন অপেক্ষা অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি। এর মধ্যে ২৫ জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করে নিয়েছে সরকার। দু-একদিনের মধ্যে এসব জেলায় নতুন ডিসি পদায়ন করা হবে।
এর আগে পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে ৪৫ জনের ডিসি ফিটলিস্ট তালিকা করে করে। তাদের মাঠ প্রশাসনের দায়িত্ব দেয়ার জন্য মৌখিক পরীক্ষাও সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে মৌখিক পরীক্ষা নেয়া কর্মকর্তাদের অনেকের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে বিভাগীয় মামলা রয়েছে। যে কারণে তাদেরকে ডিসির ফিটলিস্টে রাখা নিয়ে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে মন্তব্য করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা।
ডিসি ফিটলিস্টে থাকা ৪৫ কর্মকর্তার মধ্যে ক্রমিক ১, ১০. ১৪, ৪১ ও ৪২ সবার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। যার পরিচিতি নং-১৫৫২০। এই কর্মকর্তা চাকরিজীবনের শুরুতেই জড়িয়ে পড়েন দুর্নীতিতে। ঢাকার সহকারি কমিশনার (এসিল্যান্ড) থাকাকালে ঘুষ ছাড়া সেবা না দেয়ার কারণে অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় জন-প্রশাসন মন্ত্রণালয়। শুধু নজরুলের একার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তা নয়। ডিসির জন্য তালিকা করা ক্রমিক ১০ এ থাকা টিটন খীসার বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা টিটন খীসা তথ্য গোপন করে প্রথমে বাগিয়ে নেন উপ-সচিব পদে পদোন্নতি। এরপর ডিসির তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করাতে আর বেগ পেতে হয়নি। জানা গেছে, এক সময় টিটন খীসা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার কম্পিউটার অপারেটর ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ২৪বিসিএস-এ প্রশাসনিক ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১৫ সালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ বালু ইজারা এক উপজেলা চেয়ারম্যানকে মারধরে অপরাধে বিভাগীয় মামলা হয়। এ ঘটনায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্তে টিটন খীসার বিরুদ্ধে অভিযোগে সত্যতা পায়। ফলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় টিটন খীসার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। টিটন খীসা আদালতের আশ্রয় নিলে আদালত তাকে বেকসুর খালাস দেয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পাল্টা আপিল করে। যা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। যার কারণে পদোন্নতি এতদিন আটকে ছিল বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। অন্তর্বর্তীকালিন সরকার দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ভাগ্য খুলে যায়। এখন ডিসি পদে পদায়নের অপেক্ষায় এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা।
আর ডিসির ফিটলিস্টে থাকা ক্রমিক ১৪ এ ঠাকুরগাঁও জেলা পরিষদের নির্বাহী বাদল চন্দ্র হালদার। যার পরিচিতি নং-১৫৮৪২। এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ভ‚মি সংক্রান্ত সেবার নামে সার্ভেয়ারদের সঙ্গে পরস্পর যোগসাজনে দুর্নীতি করতেন। অভিযোগ রয়েছে, বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা ভ‚মি কার্যালয়ের জরিপকারক (সার্ভেয়ার) তাইয়ুবুর রহমান মানুষের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে জমি সংক্রান্ত কাজ করে দিতেন। পাথরঘাটার এই ভ‚মি কার্যালয়ে ২০১১ সালের ১ জুলাই তাইয়ুব যোগদান করেন। যোগদান করার পর থেকেই তাইয়ুব লোকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জমিসংক্রান্ত কাজ করে দিতেন। স¤প্রতি বদলি হওয়া পাথরঘাটার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভ‚মি) বাদল চন্দ্র হালদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে তিনি এ কাজ করতেন।
শ্বাশুড়ির নামে সরকারি জমি বরাদ্ধ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে চাপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের সচিব মো আফাজ উদ্দিন এর বিরুদ্ধে। যার পরিচিতি নং-১৬২০১। আর বাগেরহাট জেলা পরিষদের সচিব ঝুমুর বালার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলাও রয়েছে। যার পরিচিতি নং-১৬২৩৯। তিনিও ডিসি ফিলিস্টের তালিকায় রয়েছেন।
এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বলেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ডিসিফিটলিস্টে বিবেচনায় আনা নিন্দনীয়। বাছাই প্রক্রিয়ায় যারা ছিলেন তাদের সতর্কতার সাথে যাচাই-বাছাই করতে হবে। মাঠ প্রশাসনে সৎ ও কর্মঠদের পদায়ন করা উচিৎ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

