টেকনাফ করেসপন্ডেন্ট, কক্সবাজার :: কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় কয়েক দিনের টানা ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ডুবে গেছে কয়েকশ ঘরবাড়ি। দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
পাহাড় ধসের শঙ্কায় পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করেছে উপজেলা প্রশাসন। পানিবন্দি পরিবারগুলোকে শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে।
টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহেসান উদ্দিন বলেন, “টেকনাফ উপজেলায় টানা কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে সেন্টমাটিন, হ্নীলা, হোয়াইক্যং, বাহারছড়া, সাবরাং ও সদর ইউনিয়নের অন্তত ৭০টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
“বৃষ্টির পানিতে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট প্লাবিত হওয়ায় দুর্ভোগ পড়েছে এসব এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা।”

কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, “সোমবার রাত পর্যন্ত গত ৩০ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ভারি বৃষ্টিপাত আরও কয়েক দিন থাকতে পারে। এতে ভূমিধসের ঝুঁকিও রয়েছে।”
এদিকে দুর্যোগপ্রবণ এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে আনতে কাজ করছে সিপিপি (ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি)।
সিসিপি টেকনাফ উপজেলার ১৩ নম্বর ইউনিটের ডেপুটি টিম লিডার কুলসুমা বেগম বলেন, “প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা মাইকিং করে পাহাড়ি এলাকা থেকে লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনছি এবং সার্বক্ষণিক সেবায় নিয়োজিত আছি।”
টেকনাফ আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা আমিনা খাতুন বলেন, “পাহাড়ধসের আশঙ্কায় চার সন্তান নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে এসেছি। এখানে থাকা-খাওয়ার কোনও সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু ঘরবাড়ি নিয়ে চিন্তায় আছি।”
সেন্টমাটিন দ্বীপের বাসিন্দা আলী আহমদ বলেন, “সেন্টমার্টিনের কয়েকটি গ্রামের কয়েকশ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এটি এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই দিন ধরে ঘরে ঘুমাতে পারছি না। খাবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
“মূলত বৃষ্টির পানি নামতে না পারায় মানুষের ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। তাই সংশ্লিষ্টদের উচিত এটি সমাধানের পথ বের করা।”

হ্নীলা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, তার ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের ৫ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি। জালিয়াপাড়া, সাইটপাড়া, ফুলের ডেইল, আলী আকবরপাড়া, রঙ্গিখালী লামারপাড়া, আলীখালী, চৌধুরীপাড়া, পূর্ব পানখালী, মৌলভীবাজার, লামারপাড়া, ওয়াব্রাং, সুলিশপাড়া ও পূর্ব সিকদারপাড়া গ্রামের চলাচলের রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।”
টেকনাফ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর আবদুল্লাহ মনির বলছেন, পৌরসভার কলেজপাড়া, শীলবুনিয়াপাড়া, ডেইলপাড়া, জালিয়াপাড়া, খানকার ডেইল, চৌধুরীপাড়া, কেকে পাড়ার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিতে ডুবে গেছে টেকনাফ কলেজসহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু ঘরবাড়িসহ রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে।
টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান বলেছেন, তার ইউনিয়নের মহেশখালীয়াপাড়া, নতুন পাল্লানপাড়া, তুলাতুলি, লেঙ্গুরবিল, খোনকারপাড়া, মাঠপাড়া ও রাজারছড়া ও জাহাঁলিয়াপাড়া গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
সেন্টমার্টিন ও সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপে ১৫টি গ্রাম এবং হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বা বিল, উলুবনিয়া, আমতলি, মিনাবাজার, উনচিপ্রাং, কাঞ্চনপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, রইক্ষ্যং গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা।
শাহ পরীর দ্বীপ মাঝের পাড়া এলাকার বাসিন্দা শামসুল ইসলাম বলেন, “তিন দিন ধরে বাড়িতে ঘুমাতে পারছি না। আমাদের গ্রামের প্রায় ২০০ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতার সমস্যায় ভুগছি। অল্প বৃষ্টিতেই আমাদের এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়।
“ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়ে জীবনযাপন অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো নেওয়া হয়নি।”
তিনি বলেন, “অনেক সময়ই শুকনো খাবার বা তাৎক্ষণিক সহায়তা পেয়েছি। তবে বার বার এই সাময়িক সহায়তা আমাদের সমস্যার মূল সমাধান নয়। আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা একটি স্থায়ী সমাধান চাই। প্রয়োজনে আমরা নিজেরা শ্রম দেবো, সরকারিভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করে পানি নিষ্কাশনের বা জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যবস্থা দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ চাই।”
টেকনাফের ইউএনও শেখ এহেসান উদ্দিন বলেন, “টেকনাফের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত আড়াইশ পরিবারকে সরিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে। পানিবন্দি মানুষের জন্য টেকনাফ উপজেলায় ১৫ মেট্রিক টন চাল ও ১ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। পৌঁছে দেওয়া হয়েছে ত্রাণ। ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
সিএনবিএন /টিকক্স/সিএল

