রংপুর ব্যুরো :: ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। রংপুরের পীরগঞ্জের বাবনপুর গ্রামের মানুষ নিঃশব্দে অপেক্ষা করছিলেন তাদের এক সন্তানকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত আবু সাঈদ।
২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে আন্দোলনের মধ্যে ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আবু সাঈদ। তাকে বলা হয় চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ। এক বছর আগে তার মৃত্যুতে বাবনপুর গ্রামের প্রতিটি ঘরে শোকের ছায়া নেমে আসে।
বামনপুর গ্রামের আরিপা বেগম বলেন, “আবু সাইদ মারা যাওয়ার এক বছর হয়ে গেলেও তাকে আমরা স্মরণ রাখছি। দেশের লোক তার কবরে দোয়া করার জন্য সকাল আইসোছে।
“আমার পরিচিত আত্মীয়-স্বজনও আসছে। এজন্য ভোরে আগত উঠি ঘর গৃহস্থের কাজ সারছি।”
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ আবু সাঈদের জন্ম ২০০১ সালে। মকবুল হোসেন ও মনোয়ারা বেগম দম্পতির ছয় ছেলে আর তিন মেয়ের মধ্যে সাঈদ ছিলেন সবার ছোট।
আবু সাঈদের মৃত্যুর এক বছর পূর্তির সকালে বাবনপুর গ্রামের বাসিন্দারা ফুল হাতে এ শহীদের কবরের কাছে যান এবং তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত ধরেন। এ সময় শোকে ভারি হয়ে ওঠে গোটা পরিবেশ।
আবু সাঈদের বাবার দেখা মিলল ছেলের কবরের পাশে। চুপচাপ এক পাশে বসে ছিলেন মকবুল হোসেন। চারপাশের শোকগাথা ছাপিয়ে তিনি গভীরভাবে ছেলের অস্তিত্ব অনুভব করছিলেন।
মকবুল হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টফোর ডটকমকে বলেন, “ সাঈদ কষ্ট করে লেখাপড়া করেছিল, সফলও হয়েছিল। আন্দোলনে শরিক হয়া একাই হাতটা চিত করি দিয়া শহীদ হইলো।
“আমার ছেলে মারা গেল এক বছর হইল। আমার ছেলেসহ যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের বিচার করতে হবে তারপর নির্বাচন। রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন করতে হবে।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, আবু সাঈদের কবরের চার পাশে লোহার গ্রিল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। শহীদ আবু সাঈদ স্মরণে গ্রামের রাস্তায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ব্যানার দেখা গেছে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জেলা প্রশাসক, এসপি, বেরোবির ভিসিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন শ্রদ্ধা জানায় ও কবর জিয়ারত করেন।
অনেকে আবু সাঈদের বাবা, মা, ভাই, বোনের সঙ্গে তোলেন ছবি। এ সময় নানা স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠে বাবনপুর এলাকা। শহীদ আবু সাঈদের কবরের পাশে ‘শহীদ আবু সাঈদ ফাউন্ডেশন’ কর্তৃক তাদের চলমান ও পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
কবর জিয়ারত শেষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শওকাত আলী সাংবাদিকদের বলেন, “সাঈদের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তার কবর জিয়ারত ও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আমরা এসেছি। আবু সাঈদ বাংলাদেশের জন্য যে অবদান রেখে গেছে সেটি সারাবিশ্ব দেখেছে।
“বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু সাঈদের মত একজন মেধাবী সাহসী শিক্ষার্থী ছিল। আবু সাঈদকে আমরা স্মরণে রাখতে চাই।”
জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ রবিউল ফয়সাল বলেন, “স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আবু সাঈদ বুক পেতেছিল। এই জাতি সারা জীবন তাকে মনে রাখবে। যারা শহীদ হয়েছে তাদের আমরা সারাজীবন স্মরণ করে যাব।
“তাদের যে পরিবার আছে, তাদের পাশে থাকব আমরা। আবু সাঈদের স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শুরু হয়েছে।”
সেদিন সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করার মধ্যে তাকে গুলি করার ভিডিও সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সেদিন থেকেই সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন থেকে সারা দেশে ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করা হয়।
এরপর একের পর এক মৃত্যু, সরকারি সম্পত্তিতে হামলা, আগুনের মধ্যে ১৯ জুলাই কারফিউ দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি শেখ হাসিনা সরকার। তুমুল গণ-আন্দোলনের মধ্যে ৫ অগাস্ট পতন হয় টানা সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগের শাসন। শেখ হাসিনা বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ভারতে পাড়ি জমান।
আবু সাঈদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সকাল ১০টায় রংপুরের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি শোকর্যালি বের করে।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও বিভিন্ন কর্মসূচি চলছে। সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শোক র্যালি বের করা হয়। সকাল ১০টায় কালো ব্যাজ ধারণ, শোকযাত্রা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটে ‘আবু সাঈদ তোরণ’ এবং পার্ক মোড়ে ‘আবু সাঈদ মিউজিয়াম’-এর উদ্বোধন করা হয়।
সিএনবিএন /ডি/সিএম

