স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, সিএনএন বাংলাদেশ :: চট্টগ্রাম ক্লাবের একটি কক্ষ থেকে সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হারুন-অর-রশিদের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার সকাল ১১টার দিকে নগরীর কাজির দেউড়ির মোড়সংলগ্ন ক্লাবটির ৩০৮ নম্বর কক্ষ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার মো. আলমগীর হোসেন বলেন, রোববার বিকেল ৫টার দিকে হারুন-অর-রশিদ চট্টগ্রাম ক্লাবের গেস্ট হাউস ৩০৮ নাম্বার রুমে উঠেন। আজ সকালে ক্লাব কর্তৃপক্ষ তার সাড়া না পেয়ে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে রুমের দরজা ভেঙে তার লাশ উদ্ধার করে। তার লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গেছেন। তবে ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।
হারুনুর রশিদের তিনটি শেষ ইচ্ছা
চট্টগ্রাম ক্লাবের ঘটনাস্থলে আসা তার ছোট বোনের হাসবেন্ড জানান, চট্টগ্রাম আদালতে ডেসটিনির একটা মামলার হাজিরা দিতে চট্টগ্রাম আসেন হারুনুর রশিদ। পেশায় ডাক্তার বলে তার কাছে এটি হার্ট অ্যাটাক বলে ধারণা করলেও তিনিও পোস্টমর্টেমে বিস্তারিত জানা যাবে বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ওনার শেষ তিনটা ইচ্ছার কথা আমাদেরকে আগেই বলে গেছেন। তার মধ্যে প্রথমটা হচ্ছে তাকে তার গ্রাম হাটহাজারিতে তার বাবার কবরের পাশে যেনো সমাহিত করা হয়, দ্বিতীয়টি হচ্ছে- তাকে যেনো তাড়াতাড়ি দাফন সম্পন্ন করা হয়। এবং তৃতীয়টি হচ্ছে, কোন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা যেনো দেয়া না হয়। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের বীর প্রতীক ও সেনা বাহিনীর সাবেক প্রধান হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পান। কিন্তু তিনি সে সম্মাননা নিতে নিষেধ করে যান।

ব্যক্তিগত জীবন
এম হারুন-অর-রশিদ ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। ২০০০ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে ২০০২ সালের ১৬ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করে। তার একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। বড় ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন আর মেয়ে ও তার স্ত্রী ঢাকায় থাকেন। স্ত্রী ও মেয়ে ইতিমধ্যে চট্টগ্রামের পথে।
সামরিক ক্যারিয়ার
হারুন-অর-রশিদ ১৯৭০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পিএমএ-এর ২৪তম যুদ্ধ কোর্স থেকে পদাতিক বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে, শীর্ষ ৪ ক্যাডেটের মধ্যে ৩ জনই বাঙালি এবং তিনি নিজেই তার ব্যাচে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। তার ইউনিটের পছন্দের কারণে তিনি ইঞ্জিনিয়ার কোর বেছে নেন। তবে এতে তার কোম্পানি কমান্ডার ক্ষুব্ধ হন, যিনি তাকে পদাতিক কোরে যোগ দিতে চেয়েছিলেন এবং তাকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বেছে নিতে রাজি করান। এরপর তিনি কুমিল্লায় ৪র্থ ইবিআর-এ কমিশন লাভ করেন।
পদাতিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে তিনি জর্জিয়ায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে বিশেষভাবে দায়িত্ব পালন করেন । তিনি একাডেমিক মনোভাবের অধিকারী ছিলেন বলে জানা যায়, তিনি প্রায়শই শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত থাকতেন। তিনি পদাতিক ও কৌশল স্কুলের পাশাপাশি আর্মি স্টাফ কলেজেও শিক্ষকতা করেছেন।
২০০০ সালের ২৪ ডিসেম্বর হারুন-অর-রশিদকে সেনাপ্রধান করা হয়, তিনি জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানের স্থলাভিষিক্ত হন। শান্তি চুক্তিতে অসন্তুষ্ট সন্দেহভাজন জঙ্গিরা যখন পার্বত্য চট্টগ্রামে একজন ব্রিটিশ এবং দুই ডেনিশ সার্ভেয়ারকে অপহরণ করে, তখন তিনি সেনাপ্রধান ছিলেন। হারুন-অর-রশিদ ছিলেন আর্মি গলফ ক্লাবের প্রথম সভাপতি।
সামরিক-পরবর্তী কর্মজীবন
হারুন-আর-রশিদ সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সহ-সভাপতি ছিলেন। ২০১৫ সালে তিনি পাকিস্তানকে ‘আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ হিসেবে অভিযুক্ত করেন। তিনি প্রতিরক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধিকে সমর্থন করেন; কিন্তু বিশ্বাস করেন যে- স্বাস্থ্য এবং আবাসনকে উচ্চতর অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
হারুন-অর-রশিদ ছিলেন ডেসটিনি গ্রুপের সভাপতি। ডেসটিনির বিরুদ্ধে জালিয়াতি এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ‘স্বাস্থ্য’ এবং ‘সামাজিক মর্যাদা’র ভিত্তিতে তাকে জামিন দেওয়া হয়।
জানা যায়, ডেসটিনির মামলায় হাজিরা দিতেই গতকাল রোববার চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন সাবেক এই সেনাপ্রধান।
সিএনবিএন / সিটিজি / সিএমএল

