রাজধানী ঢাকাসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ কর্মসূচি চলছে। সরকার পতনের এক দফা দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিস্ফোরণোন্মুখ সারাদেশ। অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিন রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে রক্ত ঝরেছে। অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থী-জনতার সঙ্গে আইনশৃংখলা বাহিনী ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগের কোথাও দ্বিমুখী, কোথাও ত্রিমুখী সংঘাত-সংঘর্ষে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ। এর মধ্যে আন্দোলনে অংশ নেয়া অর্ধশত ছাত্র-জনতা শহীদ হয়েছেন। ১৩ জন পুলিশ সদস্যসহ কয়েকজন নিহত হন। আন্দোলনকারীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে লাশ নিয়ে মিছিল করে শাহবাগ হয়ে বাংলা মোটরের দিকে গেলে মিছিলকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ছোড়ে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে লাঠিসোঁটা, হকিস্টিক, রামদা হাতে সরকারদলীয় সমর্থকদের দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশের বেপারোয়া গুলি এবং আইনশৃংখলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মী সমর্থদের প্রতিরোধের মুখে ব্যাপক নৈরাজ্য সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বাধ্য হয়েই অফিস-আদালত বন্ধের ঘোষণা দিয়ে গতকাল সন্ধ্যা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কারফিউ প্রত্যাখ্যান করে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা, গুলি ও হত্যার প্রতিবাদে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে এনে আজ ৫ আগস্ট করার ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ফেসবুকে ভিডিও বার্তায় এ ঘোষণা দিয়ে সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখী না দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছেন। তিনি সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ করে বলেন, এ কারফিউয়ে আপনারা দেশ এবং দেশের জনগণের পক্ষে থাকুন। কোনো খুনী সরকার এবং রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করবেন না। কারণ খুনি সরকার ষড়যন্ত্র করে সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখী করতে চায়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সেনাবাহিনী সেই ষড়যন্ত্রে পা দেবে না। শুধু তাই নয়, জনগণের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সেনাবাহিনী খুনী সরকারের গুণ্ডা বাহিনীকে প্রতিহত করবে দেশবাসী সেটাই চায়।
অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিন রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ ছিল বিস্ফোরণোন্মুখ। সর্বত্রই ছিল যুদ্ধাবস্থা। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ কর্মসূচি ঘিরে সারা দেশে সংঘাত-সংঘর্ষ, গুলি, পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শতাধিক নিহতের খবর পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন পুলিশ সদস্য। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। এছাড়া দিনভর সংঘর্ষে নরসিংদীতে ৮ জন, ফেনীতে ৯ জন, লক্ষ্মীপুরে ১১ জন, সিরাজগঞ্জে ২২ জন (১৩ পুলিশসহ), কিশোরগঞ্জে ৪ জন, রাজধানী ঢাকায় ৬ জন, বগুড়ায় ৫ জন, মুন্সীগঞ্জে ৩ জন, মাগুরায় ৪ জন, ভোলায় ৩ জন, রংপুরে ৫ জন, পাবনায় ৩ জন, সিলেটে ৫ জন, কুমিল্লায় ৩ জন (একজন পুলিশ সদস্য), শেরপুরে ২ জন, জয়পুরহাটে ১ জন, হবিগঞ্জে ১ জন, ঢাকার কেরাণীগঞ্জে ১ জন, সাভারে ১ জন ও বরিশালে ১ জনসহ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়াও রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেকের অবস্থা গুরুতর। চিকিৎসকরা বলছেন, চিকিৎসাধীন কয়েকজন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
আজ লং মার্চ টু ঢাকা ডেকেছে আন্দোলনকারীরা। এগিয়ে আনা হয়েছে তারিখ। গতকাল রোববার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সারা দেশ থেকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানানো হয় জনতাকে। ৬ আগস্ট মঙ্গলবার ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ সফল করতে সারা দেশের ছাত্র-নাগরিক-শ্রমিকদের ঢাকায় আসার আহ্বান জানানো হয়। তবে বিকালে আরেক ঘোষণায় এ লংমার্চ এগিয়ে সোমবার ৫ আগস্ট নিয়ে আসার কথা জানায় আন্দোলনকারীরা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ জানান, ‘পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এক জরুরি সিদ্ধান্তে আমাদের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্ট থেকে পরিবর্তন করে ৫ আগস্ট করা হলো। অর্থাৎ সোমবার সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করার আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি বলেন, ইতিহাসের অংশ হতে ঢাকায় আসুন সকলে। যে যেভাবে পারেন ঢাকায় কালকের মধ্যে ঢাকায় চলে আসুন। ছাত্র-জনতা এক নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাবো’।
রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ফের অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ করে বলেন, এ কারফিউয়ে আপনারা দেশ এবং দেশের জনগণের পক্ষে থাকুন। কোনো খুনী সরকার এবং রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করবেন না। কারণ সরকার ষড়যন্ত্র করে সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখী করতে চায়। কিন্তু আমি বিশ্বাস করে সেনাবাহিনী সেই ষড়যন্ত্রে পা দেবে না।
আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রত্যেকে সমবেত হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে চলে আসুন। বিশেষ করে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলো থেকে সকলে ঢাকায় জড়ো হন। সেখান থেকেই চূড়ান্ত নির্দেশনা দেয়া হবে।

