|| মো. শাহীন হোসেন ||
বিশ্ব এখন এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন, আর জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে আছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। আমাদের অর্থনীতির একটা বড় অংশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য পরিবর্তন হলেও তার প্রভাব আমাদের শিল্প, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এসে পড়ে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে আমাদের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৬৫ শতাংশই নির্ভর করছে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর, যার মধ্যে রয়েছে কয়লা, এলএনজি ও তেল; পাশাপাশি সরাসরি বিদ্যুৎ আমদানিও। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকেও এখন অনেকাংশে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আমরা প্রতিবেশী ভারত থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করি, যা এখন জাতীয় চাহিদার প্রায় ১৫.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। বিষয়টি একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি বড় অংশই আসলে বাইরের ওপর নির্ভর করে চলছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৭,৫০০ মেগাওয়াট বা তার কিছু বেশি হতে পারে। কক্সবাজারের খুরুশকুলে অবস্থিত দেশের প্রথম ও বৃহত্তম ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০২৩ সালের জুন মাসে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে এবং বর্তমানে প্রায় ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে। রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট। এছাড়াও টেকনাফ সোলার পার্ক (২৮ মেগাওয়াট), তেঁতুলিয়া সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট (৩০ মেগাওয়াট), তিস্তা সোলার পার্ক (২০০ মেগাওয়াট), কুতুবদিয়া বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র (১ মেগাওয়াট) এবং ফেনীর মহুরী বাঁধ বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র (০.৯ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।
এই সবক’টি বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় আমরা সর্বোচ্চ যে বিদ্যুৎ পেতে পারি, তা জাতীয় চাহিদার কত শতাংশ? মাত্র ৩.১৪%। আহা!
আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যাটা সম্ভবত এখানেই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজন হলেই আমদানি করেছি, কিন্তু আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে খুব একটা ভাবিনি। দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো, স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা বা বিকল্প জ্বালানি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, এসব বিষয়ে আমরা খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু কেন?
আমরা কি চাইলে সড়কবাতি, নিরাপত্তা বাতি, মার্কেট বা শপিংমলের আলোকসজ্জার মতো হাজারো বিদ্যুতের চাহিদাকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনতে পারতাম না? পৃথিবীর অনেক দেশেই বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা এখন খুব স্বাভাবিক বিষয়। এতে নিজের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়, আর সেই সঙ্গে নিজের বিদ্যুৎ বিলও কমে। বিকল্প ও সহজলভ্য বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বিশ্ব আজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটছে।
কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের উদ্যোগ খুব একটা চোখে পড়ে না। জনসচেতনতা যেমন কম, তেমনি নীতিগতভাবেও বিষয়টি খুব শক্তভাবে এগিয়ে নেওয়া হয়নি। বড় বড় মার্কেট, বাজার বা শপিংমলগুলোতে বিপুল পরিমাণ আলোকসজ্জা করা হয়। এই আলোকসজ্জার বিপরীতে যদি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করা যেত, তাহলে এ ধরনের বিদ্যুতের চাহিদার একটি বড় অংশই বিকল্প উৎস থেকে মেটানো সম্ভব হতো।
গত প্রায় দেড় দশকে আমরা অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করেছি। এমনকি জাতীয় চাহিদার চেয়েও বেশি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিদ্যুৎ উৎপাদন করবো কী দিয়ে? শেষ পর্যন্ত সেই আমদানিকৃত জ্বালানিই তো ভরসা।
মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমরা যেন খুব ধনী জাতি! কারণ বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, জ্বালানি, খনিজ, খাদ্যদ্রব্য বা শিল্প কাঁচামালের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের পাশাপাশি আমরা টমেটো, গাজর পর্যন্ত আমদানি করে খাই।
জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই হালহকিকত আমাদের জাতীয় সংকটের একটি শাখা মাত্র। আমাদের সমস্যার তালিকাও যেন শেষ হওয়ার নয়।
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। জ্বালানির সরবরাহে সমস্যা হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে, রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও মন্থর হয়ে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য তৈরি করা। সৌর ও বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা উন্নত করার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে একটা কথা সত্য, উদ্যোগ নিতে কখনোই খুব বেশি দেরি হয়ে যায় না। আমরা যদি এখন থেকেই পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারি, জনসচেতনতা বাড়াতে পারি এবং বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে পারি, তাহলে আগামী ১০ বছরের মধ্যেই জ্বালানি খাতে আমাদের আমদানি নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
–
লেখক: মো. শাহীন হোসেন, বিসিবি কর্মকর্তা

