স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট :: চট্টগ্রামের জঙ্গল ছলিমপুরে ‘মাইকে ঘোষণা’ দিয়ে নিজেদের সদস্যদের ওপর হামলা হওয়ার কথা বলেছে র্যাব।
সোমবার রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে র্যাব-৭ এর পক্ষ থেকে বলা হয়, বিকাল সোয়া ৪টার দিকে জঙ্গল ছলিমপুর এলাকায় ‘অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী’ গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে অভিযান চালানো হয়।
“এসময় র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে মাইকে ঘোষণা দিয়ে আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ জন দুষ্কৃতকারী র্যাব সদস্যদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়।”
হামলায় র্যাবের চারজন সদস্য ‘রক্তাক্ত আহত’ হয় তুলে ধরে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরবর্তী সময়ে থানা পুলিশের সহযোগিতায় তাদেরকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম সিএমএইচে নেওয়া হয়। এর মধ্যে নায়েক সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
বাকি তিনজন চট্টগ্রাম সিএমএইচে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে র্যাব-৭ এর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেখানকার একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, সাদা রঙের মাইক্রোবাসে কালো জ্যাকেট পরা র্যাব সদস্যরা সেখানে অভিযানে যায়।
স্থানীয়দের হামলায় মাইক্রোবাস ফিরে আসার সময় ভাংচুর করতে দেখা যায়।
প্রশাসনিক কাঠামোতে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় হলেও ওই এলাকায় প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে। বায়েজিদ লিঙ্ক রোড দিয়ে ভাটিয়ারি যাওয়ার পথে ডান দিকে জঙ্গল ছলিমপুর।
খাস জমির ৩ হাজার ১০০ একর জুড়ে অবস্থান জঙ্গল ছলিমপুরের। টিলা কেটে গড়ে তোলা এ ঝুঁকিপূর্ণ বসতি পরিণত হয়েছে ‘দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্যে’।
স্থানীয় লোকজনদের কেউ কেউ বলেন, ২০০৪ সালে থেকে সেখানে বসতি শুরু হয়। বর্তমানে ৮-১০ হাজার পরিবারে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস সেখানে। পুরো এলাকাকে ১১টি ‘সমাজে’ ভাগ করা হয়েছে ব্যবস্থাপনার সুবিধার জন্য।
এলাকাবাসীর দাবি, কম টাকায় ‘জমি কিনে’ সেখানে বসতি স্থাপন করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষ। দেশের প্রায় সব জেলার মানুষই রয়েছে সেখানে, যাদের অধিকাংশ রিকশাচালক, ঠেলাগাড়ি চালক, দিনমজুর, হোটেল বয় ও গার্মেন্টম শ্রমিক।
এলাকাটির ভেতরে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, কেজি স্কুল, এতিমখানা, কবরস্থান, মন্দির, কেয়াং, গির্জা, শ্মশান বাজার সবই আছে।
সোমবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় সেখানে সংবাদকর্মীরা ‘প্রবেশ করতে পারেননি’। অবৈধ এ বসতির নিয়ন্ত্রণ নিতে স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে। বিভিন্ন সময়ে সেখানকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষের খবর আসে।
২০২২ সালে এ খাস জমি দখলমুক্ত করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, স্পোর্টস ভিলেজ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আইকনিক মসজিদ, ইকো পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা করার পরিকল্পনা নিয়েছিল সরকার। তখন উচ্ছেদ অভিযানে বারেবারে বাধার মুখে পড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। টানা উচ্ছেদ অভিযানে সেখানে ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা ক্যাম্প ও চেকপোস্ট’ বসিয়েছিল জেলা প্রশাসন।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সেখানে আবারও ‘স্থানীয় সন্ত্রাসীদের’ তৎপরতা বেড়ে যায়। কয়েকবার সংঘর্ষ ও খুনোখুনি ঘটনা ঘটে।
২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর ভোরে জঙ্গল সলিমপুরের আলিনগর এলাকায় ইয়াছিন ও রোকন-গফুর বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। তখন গুলিবিদ্ধ হয়ে রোকন বাহিনীর এক সদস্য নিহত হন। আহত হন বেশ কয়েকজন।
এ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে সাংবাদিকরা সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয়দের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।

