জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পেতে চরম ভোগান্তির দিন শেষ হচ্ছে চট্টগ্রামবাসীর। বিশেষ কমিটির বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে যাচ্ছেন তারা। কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রাম—এই চার জেলার ৩২টি উপজেলাকে বিশেষ কমিটি থেকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এনআইডি সেবা পেতে সংশ্লিষ্ট এলাকার নাগরিকদের এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে স্বদেশি হয়েও পরিচয় প্রমাণে হেন কোনো দলিল নেই, যা দাখিল করতে না হয়।
এ বিষয়ে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, আমরা কয়েকটি সুপারিশ রাখব আর এটা কমিশন অনুমোদন দেবে। চট্টগ্রাম এলাকায় যারা ওয়ান থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন, এ দেশে জন্ম নিয়েছেন, তারা সমতলের মতো আমলযোগ্য হবেন।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে এ বিষয়ে কর্মশালার আয়োজন করা হয়। সেখানে ইসি সচিব শফিউল আজিমও উপস্থিত ছিলেন। কর্মশালায় বেশ কিছু সুপারিশ এসেছে। সেগুলো সমন্বয় করে কমিশনে নথি উপস্থাপনের কাজ চলছে। এ ছাড়া গত ১৩ জুন ইসির মাসিক সমন্বয়সভায়ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন সচিব। যেসব প্রকৃত বাংলাদেশি দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে এসএসসি বা এইচএসসি পাশ করেছেন, তাদের কেন ভোটার হওয়ার জন্য ২২ ধরনের তথ্য দিতে হবে, সেই প্রশ্ন সমন্বয়সভায় তোলেন সচিব। তিনি বলেন, অন্য দেশের কেউ যাতে ভোটার হতে না পারে, সেদিকে যেমন লক্ষ রাখতে হবে; তেমনি এর জন্য দেশের প্রকৃত নাগরিক যাতে ভোগান্তিতে না পড়েন, সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে।
ইসি সচিব শফিউল আজিম বলেন, ‘আমরা দুটি কর্মশালা করেছি। সেখানে নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে আমরা সুপারিশ নিয়ে আসছি।’ তিনি বলেন, একদিকে যারা প্রকৃত বাংলাদেশি, তাদের সেবাটা কীভাবে সহজ করা যায় এবং অন্য দেশের নাগরিকদের ভোটার হওয়ার চেষ্টা কীভাবে আটকানো যায়, সে বিষয়ে সুপারিশ চাওয়া হয়েছিল। সচিব বলেন, ‘রোহিঙ্গারা শুধু ৩২টি বিশেষ এলাকার মধ্যেই নেই, এরা অন্যান্য এলাকায় গিয়েও ভোটার হওয়ার চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি রংপুরে এমন একজন ধরা পড়েছেন। এসব বিষয়ও আমাদের নজরে এসেছে। এগুলোও আমরা আমলে নিচ্ছি।’
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে বিশেষ এলাকার যেসব নাগরিকের একাডেমিক সনদ বা বৈধ কাগজপত্র আছে, তাদের সন্দেহভাজন রোহিঙ্গাদের মতো একই ক্যাটাগরিতে না ফেলে তাদের ভোটার নিবন্ধন সহজ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে। এ জন্য আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে সুপারিশসহ ২ (দুই) সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলে কমিশন। আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা সেই নির্দেশনার আলোকে ১৬ দফা সুপারিশ করেছে ইসিকে। তবে সেই সব সুপারিশ আমলে নিয়ে মূলত তিনটি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সংস্থাটি। প্রথমত, আবেদন এলেই রোহিঙ্গা সন্দেহ নয়, দ্বিতীয়ত তিনটি ক্যাটাগরিতে আবেদন ভাগ করা, তৃতীয়ত বয়স্কদের মধ্যে যেসব আবেদনকারীর পিতা-মাতা বেঁচে নেই তাদের আবেদন বিশেষ কমিটির মাধ্যমে নিষ্পত্তিকরণ।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও কক্সবাজারের তিন জেলার ১২টি উপজেলার তালিকা থেকে রোহিঙ্গা ও ভুয়া সন্দেহে মোট ৪৮ হাজার ৬৭৩ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। পরে ২০১২ সালের ১১ জালাই কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলাকে স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন। মোট ১৩টি উপজেলাকে স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে ভোটার হালানাগাদ কার্যক্রম শুরুর পর মিয়ানমার সীমান্তবর্তী স্পর্শকাতর উপজেলাগুলোয় ভোটার তালিকা হালনাগাদে রোহিঙ্গা ভোটারের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে টিএনও, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়। শুধু এই স্পর্শকাতর এলাকার জন্য নানা তথ্য সংযুক্ত করে ছাপানো হয় বিশেষ ভোটার তথ্য ফরম। ছাপানো বিশেষ ফরমে ভোটারের দাদা-দাদি, ফুফু-খালা বা তিন জন নিকটাত্মীয়ের ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়। রোহিঙ্গারা সমতলে ছড়িয়ে পড়ায় ২০১৯ সালে নির্বাচন কমিশন চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৩২টি উপজেলা বা থানাকে বিশেষ এলাকা ঘোষণা করে। ঐ ৩২ উপজেলা বা থানার ভোটারযোগ্য ব্যক্তিদের নিবন্ধনের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে ‘বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়। ঐ কমিটির যাচাইবাছাই এবং সুপারিশপ্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার নিবন্ধন সম্পন্ন হয়।
বিশেষ এলাকাগুলো হলো কক্সবাজার সদর উপজেলা, চকোরিয়া, টেকনাফ, রামু, পেকুয়া, উখিয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া। বান্দরবানের সদর, রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, আলীকদম, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা। এছাড়া রাঙ্গামাটির সদর, লংগদু, রাজস্থলী, বিলাইছড়ি, কাপ্তাই, বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি ও বরকল এবং চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগড়া, বাঁশখালী, রাঙ্গুনিয়া ও কর্ণফুলী উপজেলাকে বিশেষ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসব এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) আহ্বায়ক ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করে গঠিত ১৫ সদস্যের বিশেষ কমিটির কাজও নির্ধারণ করে দিয়েছিল ইসি। বিশেষ কমিটির মাধ্যমে ভোটার হতে গেলে ভাইবোন, পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, মামা, ফুফু, খালা ইত্যাদির তথ্য; বাড়ির জমির দলিলসহ বিভিন্ন ধরনের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হয়। এতে রোহিঙ্গা বা ভিনদেশিদের কারণে দেশের নাগরিকদেরও সেবাপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে যায়। তাই এখন থেকে সব আবেদন বিশেষ কমিটিতে না নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এতে সমতলের মতোই অধিকাংশ আবেদন নিষ্পত্তি হবে।
ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, ‘আমরা আলোচনায় রেখেছি, তিনটা ক্যাটাগরির আবেদন থাকবে। ক, খ ও গ। শুধু গ ক্যাটাগরির যেটা থাকবে, ৩৯ শতাংশ আবেদন বিশেষ কমিটিতে যাবে। আর সব সমতলের মতো হবে। ৭০ শতাংশ আবেদন এমনিতেই নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। আবেদন পাওয়ার পর প্রথমে বাছাই হবে। যারা এ দেশে পড়াশোনা করেছেন, জন্ম নিয়েছেন, বাবা-মা সরকারি চাকরি করেন বা বাংলাদেশেই আছেন, এনআইডি আছে, তার ভাইবোনের সব এনআইডি আছে, তারা এই সমতলের মতোই হবে। শুধু সি (গ) ক্যাটাগরির যারা, তাদের আবেদন বিশেষ কমিটিতে যাবে। যারা বয়স্ক এবং যাদের বাবা-মা বেঁচে নেই, এগুলো বিশেষ কমিটিতে যাবে। এখন কমিশন এটা অনুমোদন দিলে সেভাবে হবে।

