অনন্ত হাসান মাসুদ, অতিথি প্রদায়ক :: দস্যুরানী ফুলন দেবী, এক নাম যা প্রতিশোধ, নৃশংসতা এবং ভারতীয় সমাজের গভীর ট্র্যাজেডির প্রতীক। উত্তর প্রদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেওয়া এই নারী তার জীবনের শুরু থেকেই ছিলেন চরম নির্যাতনের শিকার। মাত্র এগারো বছর বয়সে, পারিবারিক চাপে, ত্রিশোর্ধ্ব পুতিলাল নামে এক ব্যক্তির সাথে তার বিয়ে দেওয়া হয়। স্বামীর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন থেকে বাঁচতে শিশু ফুলন বারবার বাড়ি ফিরলেও, সমাজের চাপে তাকে আবার সেই নরকীয় জীবনে ফেরত পাঠানো হয়। এই ঘটনাগুলিই কৈশোরে তার মনে নির্মমতার বীজ বপন করেছিল। ১৯৭৯ সালে জমি নিয়ে পারিবারিক বিবাদের জেরে চাচাতো ভাইকে পাথর ছুঁড়ে আহত করার পর তাকে স্থানীয় পুলিশ আটক করে এবং থানায় চরম লাঞ্ছনা ও মারধরের শিকার হতে হয়। ফুলন দেবীর জীবনের এই শুরুটাই ছিল অত্যাচারের এক দীর্ঘ আখ্যানের পূর্বাভাস। তার এ গল্প কাঁদিয়েছে বিশ্ববাসীকে !
১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে, পারিবারিক কলহের জেরেই কিশোরী ফুলন দেবীকে তার বাবার বাড়ি থেকে অপহরণ করে বাবু গুজ্জর নামে এক কুখ্যাত ডাকাত দল। তার জীবনীকার মালা সেনকে দেওয়া ভাষ্য অনুযায়ী, গুজ্জর তাকে টানা তিন দিন ধরে ধর্ষণ করে। কিন্তু এই দলটিরই আরেক ডাকাত বিক্রম মাল্লা ফুলন দেবীর প্রতি আকৃষ্ট হন। অপহরণের তিন দিনের মধ্যেই বিক্রম গুজ্জরকে খুন করে দলের নেতা হন। বিক্রম মাল্লার সঙ্গেই ফুলন দেবীর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বিক্রম তাকে অস্ত্র চালানো শেখান এবং তাকে দলের সদস্য করে নেন। পরের প্রায় এক বছর ফুলন দেবী এবং বিক্রম মাল্লার ডাকাত দল উত্তর প্রদেশের দেভারিয়া, কানপুর এবং ওরাই অঞ্চলে ত্রাস সৃষ্টি করে। তবে, নিম্ন বর্ণের এবং দরিদ্র হিন্দুদের মধ্যে তিনি ‘দস্যু সুন্দরী’ হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, যারা ফুলন দেবীকে তাদের ওপর হওয়া অত্যাচারের প্রতিশোধের এক প্রতিমূর্তি হিসেবে দেখত।
ফুলন দেবীর জীবনে স্বস্তির এই সময়কাল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিক্রম মাল্লার ডাকাত দলেরই উচ্চ বর্ণের সদস্য শ্রীরাম, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বিক্রমকে হত্যা করে এবং ফুলন দেবীকে অপহরণ করে কানপুরের কাছে বেহমাই গ্রামে নিয়ে যায়। এই গ্রামটি ছিল উচ্চ বর্ণের ঠাকুর গোত্রীয় ক্ষত্রিয় হিন্দুদের অধ্যুষিত। বেহমাই গ্রামে ফুলন দেবীকে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে শ্রীরাম ও তার সঙ্গীরা লাগাতার গণধর্ষণ করে। মালা সেনের লেখায় উঠে আসে সেই ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা; ফুলন দেবীকে নাকি গ্রামবাসীর সামনে দিয়ে নগ্ন অবস্থায় কুয়া থেকে জল আনতেও পাঠানো হয়েছিল। এই নির্মমতা ফুলন দেবীর ভেতরে প্রতিশোধের আগুনকে চূড়ান্তভাবে জ্বালিয়ে দেয়। বেহমাইয়ের এই বীভৎস অভিজ্ঞতা তাকে আর মানবিক থাকতে দেয়নি, বরং এক কঠোর হৃদয়ের প্রতিশোধকামী মানুষে পরিণত করেছিল।
বেহমাইয়ের বিভীষিকা থেকে পালিয়ে ফুলন দেবী আরেক দস্যু মান সিংয়ের সাথে নতুন ডাকাত দল গঠন করেন। এরপর ১৯৮১ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি, তিনি তার প্রতিশোধের চূড়ান্ত রূপ দিতে দল নিয়ে বেহমাই গ্রামে ফিরে যান। তারা সেখানে শ্রীরামকে খুঁজে না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ২২ জন ঠাকুর সম্প্রদায়ের পুরুষকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করেন। এই বেহমাই হত্যাকাণ্ড সারা ভারতে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ফুলন দেবীকে ‘দস্যুরানী’ হিসেবে কুখ্যাতি এনে দেয়। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর তাকে গ্রেফতারের জন্য চরম চাপ সৃষ্টি হয়। প্রায় এক বছর চেষ্টার পরেও যখন তাকে ধরা যায়নি, তখন মধ্য প্রদেশের পুলিশ তাকে আত্মসমর্পণের জন্য চাপ দিতে শুরু করে।
দীর্ঘ আলোচনা এবং শর্ত সাপেক্ষে ফুলন দেবী ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মধ্য প্রদেশের ভিন্ড জেলায় তার দলের সঙ্গে আত্মসমর্পণ করেন। আলোচনার দায়িত্বে ছিলেন ভিন্ডের তৎকালীন এসপি রাজেন্দ্র চতুর্বেদি। আত্মসমর্পণের অন্যতম শর্ত ছিল, তাকে কখনোই উত্তর প্রদেশের জেলে রাখা হবে না। তিনি দীর্ঘ এগারো বছর জেলে কাটান। ১৯৯৪ সালে ফুলন দেবীর বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা তুলে নেওয়া হয় এবং তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর তার জীবন সম্পূর্ণ নতুন দিকে মোড় নেয়। ১৯৯৬ সালে সমাজবাদী পার্টি তাকে লোকসভা নির্বাচনের টিকিট দিলে তিনি মধ্য প্রদেশ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচনে জয়ী হয়ে নিপীড়িত মানুষের প্রতিবাদের এক মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠেন।
দস্যুরানী থেকে সংসদ সদস্য, ফুলন দেবীর এই উত্থান ছিল বিস্ময়কর। কিন্তু তার ট্র্যাজিক জীবনসংগ্রামের সমাপ্তি ঘটে সংসদ সদস্য থাকা অবস্থাতেই। ২০০১ সালের ২৫শে জুলাই, নতুন দিল্লির বাসভবনের সামনে তাঁকে গুলি করে হত্যা করে শের সিং রানা নামের এক যুবক। ফুলন দেবীর স্বামী উমিদ সিং পরে জানান, আততায়ী শের সিং রানা তাদের পরিবারের সাথে সখ্যতা তৈরি করেছিল। এই হত্যাকাণ্ডের পর শের সিং রানাকে গ্রেফতার করা হয়, যদিও তিনি একবার জেল থেকে পালিয়ে গিয়ে আবার ধরা পড়েন। পরে ২০১৪ সালে দোষী সাব্যস্ত হলেও ২০১৬ সালে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

